চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে জব্বারের বলী খেলায় এবারের ১১৭তম আসরে ফের চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসব কথা বলেছেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। এ নিয়ে টানা তিন বছর সবার সেরা হলেন শরীফ। এবারের আসরে ১০৮ জন বলী খেলায় অংশ নেন।
পেশায় গরুর মাংস ব্যবসায়ী হলেও জব্বারের বলী খেলায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন কুমিল্লার হোমনা থানার মনিপুর গ্রামের বলী মো. শরীফ। বলী খেলায় বারবার চ্যাম্পিয়ান হন বলে সবার কাছে ‘বাঘা শরীফ’ নামে পরিচিত তিনি। এ বছরের ফাইনালে বাঘা শরীফ ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের বলী খেলায় রাশেদ বলীকে পরাজিত করে শিরোপা ছিনিয়ে নেন। এ নিয়ে ১১৫ তম আসর থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছেন শরীফ। গতকাল শনিবার বিকেলে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি মাঠে দিনব্যাপী বলী খেলার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ফাইনাল খেলায় দুই বলীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলেন দুই বলী বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী। শেষ হাঁসি হাসেন শরীফ।
চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ বলেন, ‘১৪ বছর ধরে বলী খেলা খেলছি। অনেকক্ষণ ধরে বলী খেলে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করেই বিজয় চিনিয়ে নেই। এ কৌশলে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমার পাশের গ্রাম ওমরাবাদের আরেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলী ভাই আমার ওস্তাদ। কিভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হয় তার কাছ থেকে অনেক টিপস শিখিছি। তাঁর সঙ্গেই জব্বারের বলীখেলায় খেলতে এসেছিলাম। তার কারণেই এখন আমি সারা দেশে বাঘা শরীফ নামে পরিচিত। আর কয়েক বছর খেলে তারপর অবসর নেবো।’
বাঘা শরীফ পেশায় গরুর মাংস ব্যবসায়ী হলেও এখন তার নেশা ও ভালোবাসা বলীখেলা। বলীখেলায় বীরত্বের কারণেই সারা দেশে তিনি ‘বাঘা’ শরীফ উপাধি পেয়েছেন। কুমিল্লার হোমনা থানার স্থানীয় মণিপুর বাজারে শরীফের গরুর মাংসের দোকান। তাঁর বাবা, চাচার সঙ্গে ওই দোকানে বসেন শরীফও। গত ১৪ বছরে শতাধিক বলী খেলায় বিজয়ী হয়েছেন বলে জানা শরীফ। তবে জব্বারের বলী খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দ্রুতই সারা দেশে খ্যাতি পেয়ে যান।

২০২৫ সালের ফাইনালে ১১ মিনিট খেলা হলেও এবার দ্বিগুণ ২৫ মিনিট টান টান উত্তেজনাপূর্ণ জমজমাট খেলা চলেছে। প্রখর রোদের মধ্যে প্রথম রাউন্ডের বাছাই উর্ত্তীণ হন বাগেরহাটের মো. মামুন বলী, কুমিল্লার দিপু, নারায়ণগঞ্জের নুরুল ইসলাম ও সাভারের মো. মিঠু। এর আগে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় মিঠু ও রাশেদ বলী। খেলায় মিঠুকে হারিয়ে রাশেদ ফাইনালে উঠেন। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় বাঘা শরীফ ও শাহ জালাল। সমঝোতার ভিত্তিতে বাঘা শরীফকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। চুড়ান্ত পর্বে ফাইনালে মুখোমুখী হন গতবারের দুই ফাইনালিস্ট বাঘা শরীফ ও রাশেদ। এ নিয়ে টানা তিন আসরে ফাইনালে মুখোমুখী হয়েছেন তারা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জিতেছেন মিঠু। রাশেদ বলীও কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের নসরাইল গ্রামের বাসিন্দা। খেলার শুরুতে পঞ্চাশ উর্ধ্ব চার বলীর দুটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েকজন তরুণ বলী খেলায় অংশ নেন। খেলা চলাকালে দর্শকরা হাততালি দিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিয়ে প্রাণবন্ত করে তুলেন আয়োজন। অন্যবারের মতো এবারের আসরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১০৮ জন বলী খেলায় অংশগ্রহণ করেন।
বলীখেলা আসরের উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ(সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী। খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ বলীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুবকদের সংগঠিত ও শারীরিক ভাবে প্রস্তুত করতে চট্টগ্রাম শহরের বদর পাতির ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার সওদাগর ১৯০৯ সালের বাংলা ১২ বৈশাখ লালদীঘি ময়দানে আয়োজন করেন বলী খেলা নামে পরিচিত। বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১২ বৈশাখ চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক লালদিঘী মাঠে জব্বারের বলী খেলা হয়ে আসছে প্রতিবছর। খেলাকে কেন্দ্র করে হওয়া মেলা রূপ নিয়েছে চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের উৎসবে। লালদিঘী মাঠের আশপাশ ঘিরে প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আগের দিন ও পরের দিন মিলিয়ে তিন দিন হয় চলে লোকজ মেলা।
Leave a Reply