শিশির মাহমুদ
উত্তর চট্টগ্রামের ভিআইপি সংসদীয় আসন রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির হয়ে নির্বাচনের মাঠে রয়েছে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। প্রতিদিন এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন তার পরিবারের সদস্যরা। আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা: রেজাউল করিমের সঙ্গে রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরীর ব্যবসায়ীক ঘনিষ্টতা নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিএনপির হুম্মাম ও জামায়াতের করিমের এ নিয়ে চলছে কথার লড়াই। ভোটের মাঠে চাপ বাড়তে থাকায় হুম্মাম কাদের চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামা খান, মা ফারহাত কাদের চৌধুরী ও বড় বোন ফারজিন কাদের চৌধুরী প্রতিদিন রাঙ্গুনিয়ার এলাকার পর এলাকায় গণসংযোগ করছেন। ভোটারদের মন জয় করতে কোন ফাঁকফোকর রাখছেন না হুম্মামের পরিবার।
একইভাবে উত্তর চট্টগ্রামের আরেকটি হট সিটে পরিনত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা সীতাকুন্ড সংসদীয় আসন। এখানে ভোটের প্রচারণা শুরুর আগ থেকেই বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়েছে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী। আসলাম চৌধুরীর ঋণখেলাপীর অভিযোগ নিয়ে রিটানিং কর্মকর্তা থেকে নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত প্রার্থীতা বাতিলে জোরদার লড়াই করেছে জামায়াত প্রার্থী। ভোটের মাঠে জামায়াতের পরিকল্পিত ওঠান বৈঠক ও নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার কৌশলে ভোটের মাঠে বাড়তি চাপে পড়েছে বিএনপি প্রার্থী। তাই প্রার্থী চৌধুরীর স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা কোমর বেঁধে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১৬ আনা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন চৌধুরীকে জেতাতে। বিএনপির প্রার্থী স্ত্রীর পাশাপাশি তাদের মেয়ে মেহরীন আনহার উজমা বাবার জন্য ধানের শীষে ভোট চাইছেন ঘুরে ঘুরে।
জামায়াত প্রার্থীর জোরদার প্রচারণায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী লিয়াকত আলী ভোটের মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট ভাগাভাগির সুবিধাও তুলতে চাইছে জামায়াত। তাই স্বামী মিশকাতুল পাপ্পাকে বিজয়ী করতে প্রথম বারের মতো ভোটের মাঠে প্রচারণায় নেমেছেন তার স্ত্রী আনিলা ইসলাম চৌধুরী। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করছেন। পাপ্পাকে জেতাতে তার ভাইও প্রচারণার কোন কমতি রাখছেন না।
বিএনপির শক্ত অবস্থা থাকা চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ) আসনে সাবেক এমপি ওয়াহিদুল আলম পরিবারের বাইরে প্রথমবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এখানে জামায়াতের পাশাপাশি হেফাজতের শক্ত অবস্থান থাকায় শেষ মুহুর্তে ভোটের সমীকরণ কোন দিয়ে যায় তা পরিস্কার নয়। এখানে বিএনপির উপ দলীয় শক্ত কোন্দল থাকায় ভোটের সমীকরণ সরল নয়। তাই ভোটারদের থেকে ভোট আদায়ে সবধরণের কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে মীর পরিবার। ছেলে হেলালের জন্য ভোট চাইছেন বাবা সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। হাটহাজারীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণসংযোগসহ সভা-সমাবেশ করছেন মীর হেলালের স্ত্রী নওশিন আরজান হেলাল। তিনি মহিলা দলের নেত্রীদের সঙ্গে নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে গণসংযোগসহ সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।
বিএনপির অভ্যান্তরীণ কোন্দল চরম মাত্রায় থাকা এবং জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিএনপির ঘাঁটি চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা আসনে কঠিন লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজামকে বিজয়ী করতে তার স্ত্রী নাজনিন নিজাম রাতের ঘুম হারাম করে নারী ভোটারদের মধ্যে জোরদার প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারী ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বামীর জন্য ভোট চাইছেন। প্রার্থী বাবার জন্য ছেলে শাহওয়াজ জামাল নিজাম সনিও আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে বাবার জন্য ভোট চাইছেন।

রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরীর মা ফারহাত কাদের চৌধুরী বলেন, আমার স্বামী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এখানে আগেও নির্বাচন করেছেন। তিনি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। চিন্তা করতেন। তার অত্যন্ত প্রিয় ছিল হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তাকে আপনাদের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন। আপনাদের জিম্মায় আমার ছেলেকে তুলে দিতেই আমি এখানে এসেছি। তাকে ভোট দিন, আপনারা সেবা পাবেন।
সীতাকুন্ডের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মেয়ে মেহরীন আনহার উজমা বলেন, বাবা বিজয়ী হলে নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও ভাতা কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণ করা হবে। বাজারকেন্দ্রিক কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে আমার পরিবার। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বাবা ও বিএনপি কাজ করবে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি স্বজনদের বিরামহীন প্রচারণায় গ্রামে গ্রামে সর্বত্র উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। মাঘের শীতের মাঝেও নির্বাচনী মাঠে চট্টগ্রামের ১৬ আসনের বড়-ছোট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১১৫ জন প্রার্থীসহ তাদের স্বজনদের প্রচারণা উত্তাপ ছড়াচ্ছে। প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন প্রার্থীদের স্ত্রী, ছেলে মেয়েরা। প্রার্থীদের বৃদ্ধ বাবা-মাও সন্তানদের জন্য ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ১৩ আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর এবং একটি আসনে বিএনপির সঙ্গে এনসিপির ও জামায়াত ত্রিমুখী লড়াইয়ে রয়েছে। তাই বিএনপির প্রার্থীর সাথে সমানে সমান টক্কর দিয়ে ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও এলডিপির প্রার্থীরা।
Leave a Reply