শিশির মাহমুদ
মীর মজিবুর রহমান খান(৬০) পেশায় বাবুর্চি, গ্রামের বাড়ী চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার পূর্ব চাম্বল গ্রামে। ব্যক্তিগত জীবনের তিনটি বিবাহ করেছেন। সম্পত্তি বিক্রি করেই তিনি প্রতিবার বিয়ে করেন। ২০২৪ সালের ৬ জুন চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে এসে নিখোঁজ হন। তারপর দুই বছর পর মজিবুর নিখোঁজের রহস্য উন্মোচন করলেন পিবিআই। নিজ বাবাকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে ফটিকছড়ির গ্রাম থেকে চট্টগ্রাম শহরে এনে পরিকল্পিতভাবে খুন করেন নিজ ছেলে বেলাল হোসেন। ঘটনা ধাপাচাপা দিতে নিজের ভায়রার(স্ত্রীর বোনের স্বামী) সহযোগিতায় চট্টগ্রামের সাগরপাড়ে বাবার লাশ গুম করার চেস্টা করেন ঘাতক ছেলে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম মেট্টো পিবিআই’র পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম জানান, ভিকটিম মজিবুর রহমান তিন বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্ত্রীর ঔরসে বেলাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন দুই ছেলে, দ্বিতীয় স্ত্রীর ঔরসে সালমা খানম নামে এক মেয়ে রয়েছে। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মজিবুর রহমান দ্বিতীয় স্ত্রীর নানার বাড়ী ফটিকছড়িতে বসবাস করে আসছেন। ২০২২ সালে দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তিনি কিছুটা বিমর্ষ অবস্থায় ছিলেন। বাঁশখালী থানা এলাকায় তার কিছু জমি বিক্রিয় করে প্রথমে মেয়ে সালমা খানমকে কিছু টাকা দেন। এতে তার প্রথম স্ত্রীর ছেলে বেলাল ক্ষিপ্ত হন। সে ধারণা করে বাবা তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করছেন। পরে বাবা দুই কানি সম্পত্তি বিক্রির উদ্যেগ নিলে সম্পত্তি বিক্রয় করা থেকে বাবাকে বিরত রাখতে হত্যার পরিকল্পনা করে বেলাল।
পিবিআই তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, আসামি বেলাল হোসেন পরিকল্পনা অনুযায়ী তার পূর্ব পরিচিত প্রমিকা এক নারীর মাধ্যমে ভিকটিম বাবার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করার পরামর্শ দেন। বেলালের পরামর্শে ওই নারী ভিকটিম মজিবুর রহমানের সাথে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর মধ্যে ভিকটিম মজিবুর রহমান ফটিকছড়ি থেকে ২০২৪ সালের ৬ জুন চট্টগ্রাম শহরে মেয়ের বাসায় বেড়াতে আসে। মেয়ের বাসায় থাকার সময় ওই নারী ভিকটিম মজিবুর রহমান ৭ জুন সকালে তার বাকলিয়ার আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরীর নিকটস্থ ভাড়া বাসায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যান। নারীর বাসায় পূর্ব থেকেই বেলাল হোসেনের স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী আবদুল জলিল উপস্থিত ছিল। তারা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে ভিকটিমকে পান করিয়ে অচেতন করেন। বিকাল ৩টায় আব্দুল জলিল ও নারীর বাসার পাশে আগে থেকেই অপেক্ষারত বেলাল ভিকটিমকে নিয়ে সিএনজি করে সিআরবি এলাকায় যায়। সেখানে ভিকটিমকে অটোরিক্সায় জলিলের পাহারায় রেখে বেলাল হোসেন লালদীঘি এলাকায় গিয়ে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে নিজে চালিয়ে সিআরবিতে নিয়ে আসে। অতঃপর বেলাল ও জলিল মিলে ভিকটিমকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে হালিশহর আর্টিলারী সেন্টারের বিপরীতে আউটার লিংক রোডের পাশে গাড়ি থামিয়ে মজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করে লাশ জঙ্গলে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।
পিবিআই জানায়, ভিকটিমের নিখোঁজের পর কোন সংবাদ না পেয়ে এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে ভিকটিমের মেয়ে সালমা খানম অনেক খোজাখুঁজি করে। না পেয়ে মেয়ে সালমা ওই বছরের ৮ জুলাই কোতোয়ালী থানায় একটি নিখোঁজ ডাইরি করে। ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে অপহরণ মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি পিবিআইকে মামলাটির তদন্তভার অর্পণ করেন। দীর্ঘ তদন্ত পর গত ১৩ জুন পিবিআই নগরের মইজ্জারটেক এলাকা থেকে বেলালকে গ্রেপ্তার করে। তারপরই দুই বছর পর খুনের রহস্য উন্মোচন হয়। পুলিশ বেলালের পাশাপাথি খুনে সহযোগী আবদুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
Leave a Reply