চসিকের কাছে একসঙ্গে ৫০ বছরের ‘সড়ক ট্যাক্স’ চায় জেলা প্রশাসন
শিশির মাহমুদ
চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় থাকা সিটি করপোরেশনের ১৫ একর ‘নগর সড়কের’ উপর বছরে ৯৪ হাজার ৩২০ টাকা ট্যাক্স বসিয়েছে আগ্রাবাদ ভূমি অফিস। প্রতিষ্ঠানটি ১৩৮৩ থেকে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বিগত ৫০ বছরের একসঙ্গে ৪২ লাখ ১১ হাজার ৮৪৮ টাকা ট্যাক্স চেয়ে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে(চসিক)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এবারই প্রথম চট্টগ্রাম নগরে সড়কের উপর ট্যাক্স বসানোর ঘটনা ঘটেছে।
শুধু আগ্রাবাদ নয়; নগরের গোসাইলডাঙ্গা এলাকার সাড়ে ১২ একর সড়কের উপর বছরে ৭৫ হাজার টাকা ট্যাক্স ধার্য্য করে ভূমি অফিস। বিগত ৫০ বছরের বকেয়া হিসেবে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮১ টাকা পরিশোধ করতে চসিকে চিঠি পাঠানো হয়। একইভাবে নগরের মাদারবাড়ি এলাকার সাড়ে ১২ একর সড়কের উপর বছরে ৭৪ হাজার ৫২০ টাকা ট্যাক্স ধার্য্য করা হয়। সেই হিসেবে বিগত ৫০ বছরের বকেয়া ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬৪ টাকা ট্যাক্স পরিশোধ করতে চিঠি যায় চসিকে। নগরের আরেক এলাকা বন্দরের আট একর সড়কের উপর বছরে ৪৯ হাজার ৮০ টাকা ট্যাক্স বসিয়ে ৫০ বছরের বকেয়া ২১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৮ টাকা ও মগবাজার এলাকার পাঁচ একর সড়কের উপর বছরে ৩৬ হাজার টাকা করে ৫০ বছরের বকেয়া ১৫ লাখ ৭০ হাজার পরিশোধ করতে চসিককে চিঠি দেয় আগ্রাবাদ ভূমি অফিস।
এভাবে চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে থাকা চসিকের ১ হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়কের উপর নগর ট্যাক্স বসায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনাধীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস। যা বিগত ৫০ বছরের বকেয়া একসঙ্গে ট্যাক্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৩ কোটি টাকা। যদিও অতীতে কখনো চট্টগ্রাম নগরের সড়কের উপর ট্যাক্স বসানো হয়নি, পরিশোধও করা হয়নি। সরকারের আয় বাড়াতে নতুন খাত সৃষ্টি হিসেবে ‘নগর সড়কে’ ট্যাক্স বসানো হয় চট্টগ্রামে। আর সড়কের ট্যাক্স আদায়ে র্দীঘ ৫০ বছর পর ঘুম ভাঙ্গে ভূমি অফিসের কর্তাদের। চসিকের কাছে এক-দুই বছর পর নয়, একসঙ্গে ৫০ বছরের বকেয়া ‘সড়ক ট্যাক্স’ পরিশোধ করতে বলায় মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে চসিক কর্তাদের মাথায়। এর আগে কখনো সড়ক ট্যাক্স না চাওয়ায় তা পরিশোধে নারাজ চসিক। কিন্তু ট্যাক্স আদায়ে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে এসি ল্যান্ড কর্মকর্তারা। তারা চসিকের ভূমি সংক্রান্ত রেজিস্ট্রি না করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দিয়ে চাপ বাড়িয়েছেন। চসিকের সাথে সম্পৃক্ত ভূমি রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত সকল সেবা দেওয়া বন্ধ রাখতে নির্দেশনা দেন। তারপর থেকে চসিক থেকে ভূমি, ফ্ল্যাট কেনাসহ যাবতীয় সেবা নিতে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে কোন নাগরিক সেবা পাচ্ছেন না। পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মাদারবাড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, করপোরেশন থেকে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। সেটি রেজিস্ট্রি করতে যাওয়ার পর সাব-রেজিস্ট্রার ফিরিয়ে দেন। ভূমি ট্যাক্স পরিশোধ না করায় এসি ল্যান্ডের নিষেধজ্ঞার কথা বলে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করেননি সাব-রেজিস্ট্রার।
চট্টগ্রাম নগরে চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডের প্রধান, মাঝারি ও অলিগলিসহ সর্বমোট ৩ হাজার ৪৫৯টি সড়ক রয়েছে। এসব সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৪২ কিলোমিটার। এর মধ্যে পিচ ঢালাই সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৭৫০টি, যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৬ কিলোমিটার। কংক্রিট সড়ক ১ হাজার ৪২৭টি, যার দৈর্ঘ্য ৩৬৪ কিলোমিটার। ব্রিক সলিং সড়ক ১৪১টি, যার দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার। কাঁচা সড়ক ১৪১টি, যার দৈর্ঘ্য সাড়ে ১৭ কিলোমিটার। নগরে বহদ্দারহাট থেকে পতেঙ্গা মূল সড়ক, আউটার রিং রোড, বায়েজিদ থেকে অক্সিজেন, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, ডিটি রোড, হালিশহর থেকে সিটি গেইট রোডসহ বহু সড়কের প্রস্থ ৬০ থেকে ১২০ ফুট। এছাড়া অলিগলির মাঝারি ও সংযোগ সড়ক ২০ ফুট থেকে ৪০ ফুট। গলির ভেতরের সড়কের প্রস্থ ১০ থেকে ২০ ফুট। এই হিসেবে নগরে ১ হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়ককে গড়ে ২০ ফুট ধরলে মোট সড়কের আয়তন দাঁড়ায় ৭ হাজার ১২৯ একর। নগরে বিভিন্ন মৌজায় সরকারি মৌজা রেইট(টাকা) একেক রকম হওয়ায় প্রতি একরে গড়ে ৬ হাজার টাকা ট্যাক্স ধরলে ৭ হাজার ১২৯ একর ভূমির ট্যাক্স আসে ২১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বছরে আসে চার কোটি ২৭ লাখ টাকা। তবে একে ‘মরার উপর খাড়ার গাঁ’ হিসেবেই দেখছে চসিক।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন বলেন, করপোরেশন এলাকায় থাকা সব সড়ক আমরা তৈরি করেছি, আমরাই রক্ষানাবেক্ষণ করি। এখানে অন্য কোন সংস্থার সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু কয়েক মাস আগে নগরের সব সড়কের উপর প্রথমবারের মতো ট্যাক্স বসিয়ে টাকা পরিশোধ করতে চিঠি দেয় ভূমি অফিস। বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) সঙ্গে কথা বলি। হঠাৎ কেন এ ট্যাক্স বসানো হলো, চসিক এতো টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে বিস্তারিত আলোচনা করলেও সুরাহা মিলেনি। তাই এ বিষয়ে করণীয় জানতে মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠিয়েছি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অতীতে আদায় করা হয়নি, বকেয়া রয়েছে, এমন খাতের ট্যাক্স আদায় করতে চিঠি দেওয়া হয়। তারপর নগরের সড়কগুলো থেকে ট্যাক্স আদায়ে ভূমি অফিসগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তারা আইন মেনেই ট্যাক্স ধার্য্য ও আদায়ে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে। করপোশেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফোন করেছিলেন। বিষয়টি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ছাড়া সুরাহা করার সুযোগ নেই। সরকার যদি চলাচলের সড়কের উপর ট্যাক্স না নিতে বলে আমরা নিবো না, না হলে এ ট্যাক্স সরকারকে পরিশোধ করতে হবে।
Leave a Reply