চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
নগরের ডবলমুরিং থানার বাসিন্দা সুজন দাশের শ্যালক সুমন দাশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। সুজনের মোবাইলে গত ৬ ডিসেম্বর দুপুরে ফোন আসে। বলা হয়, ‘সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার লটারির মাধ্যমে কিছু বন্দিকে মুক্তি দিতে যাচ্ছে। সেই তালিকায় আপনার শ্যালক সুমনের নামও রয়েছে। তাঁকে মুক্ত করতে চাইলে দ্রুত ৫০ হাজার টাকা পাঠান।’
কারা কর্মকর্তা সেজে একটি নম্বর থেকে এই ফোন করা হয়। বিকাশে টাকা পাঠাতে দেওয়া হয় দুটি নম্বর। তাদের কথামতো ৩৫ হাজার ও ১৫ হাজার ৩০০ টাকা পাঠান সুজন।
একইভাবে সীতাকুণ্ডের গোপ্তাখালী গ্রামের সহীদ উল্লাহর কাছে গত ১৪ নভেম্বর ফোন যায়। চট্টগ্রাম কারাগারের কর্মকর্তা পরিচয়ে তাঁকে বলেন, ‘আপনার ছেলে কারাগারে মারামারি করেছে। মামলা টেবিলে নিয়ে আপনার ছেলেকে শাস্তি দেওয়া হবে। ছেলেকে বাঁচাতে চাইলে বিকাশে পাঁচ হাজার টাকা পাঠান।’ ভয় পেয়ে তাৎক্ষণিক এক হাজার টাকা পাঠান তিনি।
সুজন ও সহীদের মতো খুলনার বাসিন্দা ইনশান গাজীর কাছেও ফোন যায়। একটি নম্বর থেকে ফোন করে কারাবন্দি ছেলে সাইফুলকে মারধর করার ও কান্নার শব্দ শোনান তারা। ছেলেকে বাঁচাতে এক লাখ টাকা পাঠাতে বলে দুটি বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়। গত ১৫ নভেম্বর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র রিকশা বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা বিকাশ করেন তিনি।
প্রতারকরা কারা কর্মকর্তা সেজে গত দেড় মাসে আট বন্দির স্বজনকে ফোন করে হাতিয়ে নেন সোয়া দুই লাখ টাকা। এতে বোঝা যায়, প্রতারকদের হাতে বন্দির স্বজনের তথ্য চলে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে কর্মরত অসাধু কারা কর্মচারী, যাদের কাছে বন্দিদের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তাদের থেকেও তথ্য পায় প্রতারকরা।
ফাঁদ পেতে যেভাবে হাতিয়ে নেয় টাকা
প্রতারকরা বন্দির কারাগারে আসা থেকে সর্বশেষ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। তারপর ওয়ার্ডে মারামারির বিচার ঠেকানো, অসুস্থতার কথা বলে চিকিৎসা করাতে, সাধারণ ক্ষমায় মুক্তিসহ নানা কূটকৌশল করে দ্রুত বিকাশে অর্থ পাঠানোর কথা বলেন। এমন জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করেন যে, অধিকাংশ বন্দির স্বজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রতারকদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে দ্রুত চাহিদার অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। পরে কারাগারে গিয়ে স্বজনের সঙ্গে কথা বললে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
কারাবন্দির স্বজনদের ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এমন ১৩টি বিকাশ নম্বরের প্রতিটি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রতারণার শিকার সুজন দাশ বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে হঠাৎ মোবাইলে ফোন আসে। কল ধরতেই কারাগার থেকে কারা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অনেক কথা বলে। তাদের কথা বিশ্বাস করে শ্যালককে মুক্ত করতে ৫০ হাজার টাকা বিকাশ করি। পরে কারাগারে গিয়ে শ্যালকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি বিষয়টি ভুয়া। ফাঁদে ফেলে আমার টাকা হাতিয়েছে প্রতারকরা। অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
অপরাধবিষয়ক সিনিয়র আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, কারাগারে বন্দি থাকা আসামির তথ্য প্রতারকদের হাতে সহজে পৌঁছানোর কথা নয়। তবে দুটি প্রক্রিয়ায় কারাবন্দি আসামির তথ্য প্রতারকদের হাতে সহজে পৌঁছায়। কারাগারের প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ১০০ আসামি বন্দি থাকে। সেখানে প্রতিদিনই একজনের সঙ্গে অন্যজনের আলাপ হয়, তথ্য আদান-প্রদান হয়। এ তথ্য আসামিদের মাধ্যমে প্রতারকদের হাতে পৌঁছাতে পারে।
এ ছাড়া কারাগারে কর্মরত অসাধু কারা কর্মচারী, যাদের কাছে বন্দিদের সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকে তাদের থেকেও প্রতারকদের কাছে তথ্য পৌঁছায়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কারা কর্মকর্তা সেজে ফোন করার কথা বলে বন্দির স্বজনের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। যারাই প্রতারিত হয়ে আমাদের কাছে আসছেন, তাদের প্রতিকার পেতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিচ্ছি।
Leave a Reply