রাজু আহমেদ
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে একটি বাসায় অজ্ঞাত বিস্ফোরণে একে একে একটি পরিবার স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিলো। চার সদস্যের পরিবারে আর কেউ বেঁচে নেই। বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে সর্বশেষ ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোটর পার্টস ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেনের মেয়ে উম্মে আইমান স্নিগ্ধা(১০) মারা যায়। এক মাস চিকিৎসাধীন ছিল সে। বিস্ফোরণের ঘটনায় সাখাওয়াত হোসেন, তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগম ও ছেলে সাফায়াত হোসেনের মৃত্যু হয়। তাঁর মেয়ে আইমান সিগ্ধা মারা যাওয়ায় পরিবারটির আর কেউই বেঁচে রইল না। ওই ঘটনায় দগ্ধ নয়জনের মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হলো।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের হালিমা মঞ্জিল নামের একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ওই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে মোটর পার্টস ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন পরিবার নিয়ে থাকতেন। বিস্ফোরণে সাখাওয়াতের পরিবারের চার সদস্য ছাড়াও তাঁর পর্তুগালপ্রবাসী মেজ ভাই সামির আহমেদ ও মেজ ভাইয়ের স্ত্রী পাখি আক্তার এবং ছোট ভাই শিপন হোসেন মারা গেছেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান বলেন, বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে আইমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। উম্মে আইমানের দুই চাচাতো ভাই–বোন আয়েশা ও ফারহান আহমেদ বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
ভিকটিম সাখাওয়াত হোসেনের শ্যালক মো. মহিউদ্দিন জনি বলেন, হাসপাতাল থেকে আইমানের লাশ নিয়ে কুমিল্লায় তাদের বাড়ি যাচ্ছি। একে একে পরিবারের সবাই না ফেরার দেশে চলে গেল। সাখাওয়াত, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ের কেউই আর বেঁচে নেই। এখন কেবল সাখাওয়াতের ভাইয়ের দুই সন্তান হাসপাতালে। অথচ এখনো বিস্ফোরণের কারণ জানা যায়নি। এটি রহস্যময়।

ঘটনার পর বিস্ফোরণের ঘটনার কারণ খুঁজে পায়নি ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্যাস লিকেজ থেকে ওই বিস্ফোরণ হয়নি। সেখানে বিস্ফোরণের সম্ভাব্য কারণ বলা হলেও প্রকৃত কারণ উল্লেখ করা হয়নি। বিস্ফোরণের সময় ভবনটির অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেঙে যায়। ফলে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফায়ার সার্ভিস ধারণা করেছিল, বাসাটির গ্যাসের লাইন থেকে নির্গত হওয়া গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গ্যাস লিকেজ থেকে এ ঘটনা ঘটেনি বলেছে কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটি। স্বজনদেরও ভাষ্য, গ্যাস থেকে এ বিস্ফোরণ হয়নি।
কেজিডিসিএলের তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বাসাটিতে গাড়ির যন্ত্রাংশের কিছু কমপ্রেসিং ইউনিট রাখা ছিল, যেগুলোতে উচ্চ চাপে গ্যাস সংরক্ষিত থাকে। এ ছাড়া গাড়িতে রং করার কাজে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থও সেখানে মজুত ছিল। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রাসায়নিক পদার্থ কিংবা যন্ত্রাংশ—এসবের যেকোনো একটি থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা গেছে, ভবনটিতে জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল না। ঘটনাস্থলে মালিকপক্ষের কোনো প্রতিনিধিকেও পাওয়া যায়নি। ভবনের অনুমোদন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাগজপত্র তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিতে মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে।
Leave a Reply