চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের রাউজানে ১০ থেকে ১২ সন্ত্রাসী ঘিরে ধরতেই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন দুই ভাই কাউসারুজ্জামান ও আশরাফুর রহমান। পেছন থেকে কাউসারুজ্জামানকে লক্ষ্য করে গুলি করলে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন । মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানের চিৎকার শুনে এলাকার লোকজন বেরিয়ে আসেন। তখন পালিয়ে যান সন্ত্রাসীরা । স্বজনেরা কাউসারুজ্জামানকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আলিখিলে এভাবেই গুলি করে খুন করা হয় বিএনপির সমর্থক কাউসারুজ্জামানকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে দেশে ফিরে আসেন দুই কন্যাসন্তানের জনক কাউসারুজ্জামান।
শুক্রবার রাতেই ১২ জনের নাম উল্লেখ করে নিহত কাউসারুজ্জামানের বাবা আবুল কালাম রাউজান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন । এরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন পূর্ব রাউজান এলাকার বাসিন্দা মো. শফি ও মো. সুমন ।
রাউজান থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, কাউসারুজ্জামান হত্যাকাণ্ডের দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউসারুজ্জামান যে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। পুলিশের সঙ্গে তার ভালো সর্ম্পক থাকায় নিয়মিত এলাকার সমস্যা নিয়ে কথাবার্তা বলেতন। সন্ত্রাসীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় তাঁকে হত্যা করা হয়। শনিবার পূর্ব আলিখিল গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। বাড়িটিতে এখনো শোকার্ত মানুষের ঢল। বাড়ির উঠানে বসে ছিলেন কাউসারুজ্জামানের বাবা আবুল কালাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এক সপ্তাহ আগে কয়েকজন সন্ত্রাসী এলাকার এক লোকের মুঠোফোন কেড়ে নেয়। ওই লোকের কাছ থেকে টাকাও নিয়ে যায় তারা। ওই দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন কাউসারুজ্জামান। বিষয়টি সন্ত্রাসীরা ভালোভাবে নেয়নি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ ঘটনার যোগ থাকতে পারে বলে আবুল কালাম মনে করেন। এলাকার কিছু লোকজনের সঙ্গে মাটি কাটা নিয়েও দ্বন্দ্ব চলছিল কাউসারুজ্জামানের। কাউসারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বড় কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সন্ত্রাসীদের হাতে মোট পাঁচজন খুন হন। তাঁরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমের খামারবাড়ির কর্মচারী মুহাম্মদ ইউসুফ (৫০), কাউখালীর শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নান (৪৫), যুবদলের কর্মী আলমগীর আলম (৪৫) ও মুহাম্মদ সাইফুল (৩০)। সর্বশেষ সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারালেন কাউসারুজ্জামান।
নিহত কাউসারুজ্জামানের বড় ভাই পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘আমার ভাই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আওয়ামী লীগের পতন দেখে বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর এখানে খেত–খামার করে চলতেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমের তথ্য দিতেন। মূলকথা, সন্ত্রাস প্রতিরোধে ভূমিকা ছিল তাঁর। এ জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এলাকার একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভিডিও করেছিলেন নিজের মুঠোফোনে। সেটির খবর পেয়ে সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর ক্ষেপে যায়। এসব কারণে তাঁকে কয়েকবার হুমকি দেয় এলাকার সন্ত্রাসীরা। সবশেষে মেরেই ফেলল। আমরা সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।’
কাউসারুজ্জামানকে হত্যার পর বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম রাঙামাটি সড়কের রাউজান চারাবটতল এলাকায়প্রথম আলো
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাউজানে ২০ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, আবার কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ২২ জন খুন হওয়া ছাড়া শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। নিহত ২২ জনের মধ্যে অন্তত ১৬ জন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
Leave a Reply