চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ বিহারি কলোনিতে এখন ভয় আর আতংকের ছাপ। দীর্ঘদিনের পুরনো কলোনিতে তিনশ’র মতো ঘর রয়েছে । কলোনির শেষ মাথা থেকে শহীদ মিনারের মুল সড়কে আসতে তিন থেকে চার ফুটের গলির রাস্তাই একমাত্র পথ। এ পথেই সকলে আসা-যাওয়া করেন হাজারো বাসিন্দা। কিন্তু সেই চেনা গলির পথটি এক রাতের ভয়াবহ গুলি তা-বে এখন কলোনির বাসিন্দা সবার কাছে আতংকের পথে পরিণত হয়েছে। পুরনো এ কলোনিতে কখনো রক্ত না ঝরলেও গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মাত্র তিন মিনিটে একের পর এক গুলি তা-ব চালিয়ে হাসান ওরফে রাজু নামে এক সন্ত্রাসীকে খুন করে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন বিহারি কলোনিতে গিয়ে বাসিন্দাদের চোখে মুখে আতংকের ছাপ দেখা যায়।
কলোনির বাসিন্দা রোজিনা আক্তার নামে এক গার্মেন্টস কর্মী বলেন, বায়েজিদে একটি কারখানায় কাজ করার সুবাধে গত ৯ বছর ধরে এ কলোনিতে বসবাস করছি। এখানে কখনো খুন-খারাবি হয়নি। আমরা শান্তিতেই বসবাস করে আসছিলাম। কিন্তু গতকাল রাতে বাইরের চার-পাঁচ যুবক ছেলে ঢুকে যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে একটি ছেলেকে খুন করলো তা দেখে এখন খুব ভয় লাগছে। বাসা থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছি না। ঘরের সামনে এভাবে গুলি করে মানুষ খুন জীবনে আর দেখিনি। কলোনির আরেক বাসিন্দা রিকশাচালক মো. নাজমুল বলেন, সারা দিন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যায় বাসা এসে চা-বিস্কুট খেয়ে মোবাইলে গেম খেলছিলাম। হঠাৎ টুশ টুশ আওয়াজ। প্রথমে আতোশবাজি মনে করেছিলাম। সাত-আট মিনিট পর চিৎকার, কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি গলির ভেতর একটি ছেলের রক্তাক্ত লাশ মাটিতে পড়ে রয়েছে। মাথা থেকে খুব রক্ত বের হচ্ছিল। রক্তে গলির পথ ভিজে যায়। তার মাথায় ও পিঠে গুলি করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে খুনের ঘটনায় আমরা সবাই আতংকে আছি।
সরেজমিন কলোনিতে গিয়ে দেখা যায় নিহত ভিকটিম হাসান ওরফে রাজুর বোনের বাসায় কলোনির মহিলারা এসে তাকে শান্তনা দিচ্ছেন। কান্না করতে করতে বোন রুমা আক্তার বলেন, বেড়াতে এসে আমার ভাই এভাবে খুন হবে সেটা মেনে নিতে পারছি না। কেন রাজুকে গুলি করে খুন করলে সেটাও বুঝতে পারছি না। রাজু কখনো কোন খারাপ কাজের সাথে যুক্ত ছিল না। সে অপরাধী হলে বাসার ভেতর লুকিয়ে থাকতো। বাসা থেকে বের হতো না। ভাইটি গত বছর বিয়ে করেছে। তার গত মাসে(এপ্রিল) একটি মেয়ে সন্তান হয়েছে। যারা শিশু মেয়েটাকে এতিম করেছে তাদের ফাঁসি চাই।
কলোনির কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দা জানান, কলোনির মুখ থেকে একটু ভেতরে পরপর আট থেকে ১০ রাউন্ড গুলির আওয়াজ হয়। তখন বাসা থেকে অনেকে বের হন। গুলি করে মাক্স পড়া পাঁচ-ছয় জন যুবক অস্ত্র হাতে দৌঁড়ে কলোনি থেকে বের হয়ে যান। তারা শহীদ মিনার এলাকায় আগে থেকে অবস্থান করা দুটি মোটরসাইকেল ও একটি নোহায় করে এলাকা ত্যাগ করেন।
নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ইন্সপেক্টর(তদন্ত) মোস্তফা কামাল বলেন, রৌফাবাদে খুনের ঘটনার তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার না হলেও পুলিশের তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের গ্রেপ্তারের চেস্টা চলছে। দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরোধের জেরে এ খুনের ঘটনা বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এখনো কেউ মামলা দায়ের করেনি।
পুলিশ জানায়, ভিকটিম রাজুর মাথার পেছনে বামপাশে গাড়ের একটু উপরে পাঁচটি গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটে পড়লে তার পিঠের মধ্যে আরো তিন রাউন্ড গুলি করে দুর্বৃত্তরা। সে মাটিতে লুটেয়ে পড়ার সাথে সাথে রক্তে ভেসে যায় গলির পথটি। পরনে থাকা টিশার্ট ও জিন্স পেন্ট রক্তে ভিজে যায়। খুবই কাজ থেকে গুলি করে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করে এলাকা ছাড়ে সন্ত্রাসীরা।
এদিকে কলোনিতে গুলিবিদ্ধ ১২ বছরের শিশু রেশমি আক্তার এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। রেশমির ভাই ফয়সাল মাহমুদ বলেন, কলোনিতে গুলাগুলির খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে দ্রুত বাসায় যাই। কলোনিতে গিয়ে ছোট বোন রেশমি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। রাজু নামে একটি ছেলেকে এলোপাতাড়ি গুলি করার সময় আমার বোনের শরীরে এসে গুলি লাগে। ছোট বোন এখন মৃত্যুশয্যায়। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। আম্মু তাকে একটি কাজে দোকানে পাঠিয়েছিলেন। তখনই গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যায়।
Leave a Reply