শিশির মাহমুদ
চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট ও আশপাশের এক ফুটপাতেই বছরে সাত কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলছে। এর মধ্যে হকার সমিতির নামে বছরে তিন কোটি টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। বাকি চার কোটি টাকা বিদ্যুতের অবৈধ লাইন ও লাইট সংযোগ দিয়ে আদায় করছে দুষ্টচক্র। নিউ মার্কেটের পরিত্যাক্ত ফুটওভার ব্রীজের নিচে ফুটপাতের উপর ব্যবসা করছেন বৃদ্ধ হকার আবদুর রশিদকে। বৃষ্টির মতো এক বছরে তাড়া করে তার দোকান সিটি করপোরেশন চার বার উচ্ছেদ করে। ফের আবার বসেছেন। ২৪ মাসে ৭ বার চলে উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা। কেমন চলছে ব্যবসা-প্রশ্ন করতেই জানান, এ ফুটপাতে ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করছি। তার আগে এখানে ব্যবসা করতেন নাজমুল আলম নামে আরেকজন হকার্স। তার থেকে ৫০ হাজার টাকায় জায়গাটি(ফুটপাত) কিনে নিয়েছি। একটু সামনে যেতেই কুমিল্লার মুরাদনগরের বাসিন্দা হকার্স আবু ছিদ্দিক প্লাস্টিকের পলি দিয়ে নতুন নতুন সাদা শার্টের দোকান(চৌকি) ঢাকতে দেখা যায়। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ৬ বছর ধরে বিদেশী শার্টের ব্যবসা করছি। এটি আগে আমার চাচা করতেন এ ব্যবসা। এখানে ব্যবসা করতে প্রতিদিন হকার্স সমিতিকে ২০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে থাকি। প্রায় চার হাজার হকার্স প্রতিদিন ২০ টাকা করে বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন। আমাদের আর কাউকে কোন চাঁদা দিতে হয় না।
কথা শেষে মুল সড়ক পাড় হয়ে বিপরীতে তামাকমুন্ডি লেইনের মুখের ফুটপাতে জিন্স পেন্টের দোকান খুলে ব্যবসা করছেন নোয়াখালীর বাসিন্দা রজব আলী। তিনি বলেন, এ এলাকায় যত হকার্স আছে সবাই এক নিয়মে ব্যবসা করে। সমিতি যেভাবে বলে আমরা সেইভাবে চলি। সমিতির ফান্ডে প্রতিদিন ২০ টাকা চাঁদা দেই। তবে সন্ধ্যার পর প্রতিটি বাতি(লাইট) জ¦ালানোর জন্য পাশের দোকানদারকে ৩০ টাকা করে দিতে হয়। মার্কেটের যে দোকান থেকে বিদ্যুতের লাইন নিয়েছি তিনিই এ টাকা নেন। চার হাজার হকার্স থেকে চার হাজার লাইটের বিপরীতে বছরে সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যবসা করছেন লাইট ব্যবসায়ীরা।
এভাবেই বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের নিউ মার্কেটের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত ৩ থেকে ৪ কোটি কিলোমিটার এলাকায় একপ্রকার রাজত্ব করছেন হকার্সরা। মানুষের চলাচলের ফুটপাতে তাদের দাপট দিন দিন বেড়েই চলছে। নিউ মার্কেট থেকে আমতল, আমতল থেকে শহীদ মিনার হয়ে সিনেমা প্যালেস, আমতল থেকে জুবলী রোর্ড, নিউ মার্কেট থেকে পুরাতন রেল স্টেশন, নিউ মার্কেট থেকে কোতোয়ালী মোড়, নিউ মার্কেট থেকে সিটি কলেজ হয়ে সদরঘাট মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল পর্যন্ত ফুটপাত এখন হকার্সদের নিয়ন্ত্রণে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নতুন মেয়র এলে নিউ মার্কেট এলাকায় হকার্স উচ্ছেদ নিয়ে ইদুর-বিড়াল খেলা শুরু হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নিয়েই চার বার অভিযান চালিয়েছেন। এর আগে মেয়র রেজাউল করিমের আমলে হয়েছে তিনবার। এভাবে ২৪ মাসে ৭ বার উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তবু শুধু বাড়ছে দোকান। সকালে উচ্ছেদ করার পর বিকেলেই ফের দখল। যতবার উচ্ছেদ হয়েছে ততবার বেড়েছে চাঁদার হার।

গত মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন চট্টগ্রাম নগরের আমতল থেকে শহীদ মিনার হয়ে সিনেমা প্যালেস সড়কের থিয়েটার ইনস্টিটিউট লাগোয়া ফুটপাতের পরপর একাধিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির দোকান, থিয়েটারের সামনে ডাবের দোকান, টং চা বিস্কুট দোকান ফুটপাতের উপর। ঠিক বিপরীত ফুটপাতের টং, কলা, ডাবের দোকানে চলে বিকিকিনি। আরেকটু এগুতেই শহীদ মিনার লাগোয়া গ্রন্থাগারের সামনের বিশাল ফুটপাতে ২০ থেকে ২৫টি দোকানে দেশীয় চেয়ার, টেবিল ও বাংলা খাটের পসরা বসিয়ে দিব্যি ব্যবসা করেন। ফুটপাতের ভেতর থাকা দোকানে মিস্ত্রিদের করাত দিয়ে কাজও করতে চোখে পড়ে। পথচারিরা হাটছেন সড়কের উপর দিয়েছ। একইভাবে নিউ মার্কেট মোড় থেকে সিটি কলেজ হয়ে রেলওয়ের সীমানা দেওয়াল ঘেঁষে ফুটপাতে সাড়িবদ্ধভাবে ফলের দোকান, তিনটি রিক্সা-সাইকেলের গ্যারেজ, ভাতের টং দোকান খোলে বসেছেন হকার্সরা। তার বিপরীতের ফুটপাতের পাশে থাকা অর্ধশতাধিক সাইকেল দোকান তাদের নতুন সাইকেলের প্রদর্শনীর সাইকেল ফুটপাতের উপর রাখায় কোন পথচারি ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারছেন না। সিটি কলেজ মোড় থেকে সদরঘাট রোডের মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের উভয় পাশে সবজির ভ্যান, মাছের ভ্যান, ফলের ভ্যান, মাংসের দোকান ফুটপাত দখল করছেন ব্যবসা-বাণিজ্য।
নগরের কোতোয়ালী থানা পুলিশের ওসি আফতার উদ্দিন বলেন, নিউ মার্কেট এলাকায় হকার্স বসছে বহুদিন ধরে। সাধারণ মানুষ যাতে ফুটপাত দিয়ে হাটতে পারে তা নিশ্চিত করেই দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছেন। সিটি করপোরেশন হকার্স উচ্ছেদের বিষয়টি দেখেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট ঘিরে তালিকাভুক্ত চার হাজারের বেশি হকার্স রয়েছে। হকার্সরা তিনটি বড় ট্রেড শ্রমিক সংগঠনের সদস্য। বিনাবাধায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করতে এ তিনটি সংগঠন সাধারণ হকার্সদের মাথার উপর ছায়া হয়ে কাজ করে। প্রতিদিন চার হাজার হকার্স থেকে সংগঠনগুলো ২০ টাকা করে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা তুলছে। যা মাসে ২৪ লাখ টাকা। বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা! এ অর্থ সংগঠনের সদস্যদের কল্যানে ব্যয়ের পাশাপাশি প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজে ব্যয় হয়ে থাকে বলে সমিতির সদস্যরা জানান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্বে হকার্সদের উপর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র ছড়ি ঘুড়ালেও এখন পাশা পাল্টে গেছে। এখন হকার্স সমিটির নিয়ন্ত্রণও বিএনপিন্থী হকার্স নেতা ও শ্রমিক দল নেতাদের কব্জায় চলে গেছে। চট্টগ্রাম সম্মিলিত হকার্স ফেডারেশনের মিরন হোসেন মিলন সভাপতি থাকলেও সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. জসিমসহ বিএনপিপন্থীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলছে হকার্সরা।
চট্টগ্রাম সম্মিলিত হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি মিরন হোসেন মিলন বলেন, নিউ মার্কেট এলাকায় পাকিস্তান আমল থেকে ফুটপাতে হকার্সরা ব্যবসা করে আসতেছে। সদস্যদের থেকে যে টাকা নেওয়া হয় তা দিয়ে অফিস, বিদ্যুত, কোন হকার্স মারা গেলে তার কফিন বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, সন্তানদের বিয়েতে অনুদানসহ নানা কাজে ব্যয় করা হয়ে থাকে। সংগঠনটির বিএনপিপন্থী সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
নিউ মার্কেট এলাকায় আবু জাফর নামে এক পথচারি বলেন, ফুটপাত দখল করে হকার্সরা পসরা সাজিয়ে বসেন। ফুটপাতে হাটার জায়গা থাকে না। পথচারীদের বাধ্য হয়েই হাঁটাচলা করতে হতো ব্যস্ত সড়ক দিয়ে। মানুষের চাপ সব সময় বেশি থাকায় পকেটমারসহ প্রায়ই নানা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছেন সাধারণ মানুষদের। এখানে হকার্স বিড়ম্বনা কখনোই শেষ হবে না।
Leave a Reply