চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
চার ভাগে ভাগ হয়ে চট্টগ্রামের জঙ্গল আলীনগরে ইয়াছিন বাহিনী তান্ডবলীলা চালিয়েছে। পাহাড় থেকে আলীনগর স্কুলে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের উপর গুলি ছুড়েন এক গ্রুপ। তার আগে ক্যাম্পটির দুই পাশের পাহাড়ের পাদদেশে নতুন টিনের ঘর করেন সন্ত্রাসীরা। সেই ঘর থেকে পজিশন নিয়ে গুলি ছোড়া হয়। একটি গ্রুপ যৌথ বাহিনীর উপর গুলি ছুড়ে তাদের ব্যস্ত রাখেন। তখনই আরেকটি গ্রুপ বোলজোডার দিয়ে লন্ডভন্ড করে দেয় ক্যাম্পের জন্য তৈরি করা নতুন অবকাঠামো। দেওয়াল থেকে টিনের চালা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয়। তাদের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল দ্রুততম সময়ে যৌথ বাহিনীর আলীনগর পৌঁছানো ঠেকানো। সেই মোতাবেক বায়েজিদ লিংক রোড টু আলীনগর সড়কের চারটি স্থানে চার-পাঁচ ফুট করে ভেকু মেশিন দিয়ে রাস্তা কেটে বড় বড় গর্ত তৈরি করে প্রতিবন্দ্বকতা সৃষ্টি করেন আরেকটি দল। তাদের পরিকল্পনা মতো যৌথ বাহিনী গাড়ি নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের দুই কিলোমিটার ভেতরে যেতে পারলেও দ্রুত আলীনগর পর্যন্ত যেতে পারেননি। যৌথ বাহিনীকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে ৩০-৪০ জনে তিন চারটি ভাগ ভাগ হয়ে হয়ে ২০০ থেকে ৩০০ জনের এক সন্ত্রাসী দল ভয়ানক তান্ডবলীলা চালায় জঙ্গল আলীনগরে। ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াছিন বাহিনী এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছে র্যাব-পুলিশ।
গতকাল সোমবার ভোর চারটার দিকে র্যাব, পুলিশ, আরআরএফ, আর্মড পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর এক হাজারের মতো সদস্য আলীনগরে পৌঁছে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। যৌথ বাহিনী আলীনগর পৌঁছানোর খবর পেয়ে আলীনগরের গভীর জঙ্গলে চলে যায় তান্ডব চালানো সন্ত্রাসীরা। পুলিশের উপর রাতে এসএমজি, একে-৪৭ এর মতো ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করেছেন বলে জানান র্যাব-পুলিশ। অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকা ১৫০ জন পুলিশ-র্যাব সদস্যও পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশসহ যৌথ বাহিনী ১০৪ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। এসময় যৌথবাহিনীর কেউ আহত হয়নি। রাতভর সন্ত্রাসীদের তান্ডব ও ভোর থেকে যৌথ বাহিনীর সাড়াশি অভিযানে ওখানে বসবাস করা সাধারণ মানুষ চরমভাবে আতংকিত। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করে। স্কেভেটরসহ ১০টি যানবাহন জব্ধ করা হয়। দুটি মোটরসাইকেল পোড়া অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বায়েজিদ লিংক রোডের প্রধান সড়ক থেকে আলীনগর পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগে। ভাঙা ও কাঁচা রাস্তার কারণে দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় সন্ত্রাসীরা এর সুযোগ নিয়ে থাকছেন বলে প্রশাসন থেকে দাবি করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের কথা রয়েছে। ভেঙ্গে দেওয়া নতুন ক্যাম্পটি তাঁর উদ্বোধন করার কথা ছিল। তার আগেই এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ২০০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা করে। সন্ত্রাসীরা এলএমজি, একে-৪৭, দেশে অস্ত্র, রাইফেল ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করেছে। যৌথবাহিনীও পাল্টা গুলি করে আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধ করেছেন। আমরা ঘটনাস্থল থেকে ৪০-৪৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করেছি। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে সম্পৃক্তদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। নিরীহ ব্যক্তিদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। সন্ত্রাসীরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে এ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা। হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসীরা দুর্গম ও ভাঙা যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ নিয়েছে। আমরা যখন রোববার রাতে ওখানে ঢুকেছি। তখন দেখেছি রাস্তার বিভিন্ন স্থানে কেটে রাখা হয়েছে। ফলে আমাদের যানবাহন এগিয়ে যেতে পারেনি। সদস্যদের হেঁটে যেতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সন্ত্রাসীরা আলীনগর থেকে পালিয়ে গভীর জঙ্গল এলাকায় চলে গেছে। সন্ত্রাসী ইয়াছিন বাহিনী এ ঘটনা ঘটিয়েছে। সে ঘন ঘন স্থান বদল করায় তাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারছি না।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে কোটি কোটি টাকার সা¤্রাজ্য ছিল। এটা হাতছাড়া হওয়ায় সন্ত্রাসীরা একটু ঝাঁকুনি দিবে, নড়াচড়া করবে এটা স্বাভাবিক। পুলিশের এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া পিছু হটার সুযোগ নেই। ইয়াসিন, রোকন যারাই জড়িত থাকুক সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। সন্ত্রাসীরা গুলি করার পর আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধ হিসেবে ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছে। পুলিশের কেউ আহত হয়নি।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ লিংক রোড থেকে পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় যেতে হয়। এখানে প্রায় তিন দশক ধরে ছিন্নমূল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার একর খাসজমিতে রাজত্ব করছেন সন্ত্রাসী ইয়াছিন ও তার দলবল। এ এলাকায় বছরের পর বছর ইয়াছিনের লোকদের অনুমতি ছাড়া মানুষতো দূরের কথা একটি প্রাণীও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন না। এখানে রাস্তা, স্কুল, ক্লিনিক সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন ইয়াছিন। রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকা। সম্প্রতি এ এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে ইয়াছিন ও তার সা¤্রাজ্যের পতন ঘটায় প্রশাসন। তারপর থেকে পুরনো সা¤্রাজ্য ফিরে ফেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে ইয়াছিন ও তার বাহিনী। তারই অংশ হিসেবে গত রোববার গভীর রাতে কয়েক ঘন্টা তান্ডব চালায় সন্ত্রাসীরা।
সরেজমিন গিয়ে জঙ্গল সলিমপুর দিয়ে ঢুকে আকাবাঁকা পাহাড়ী পথ পেরিয়ে দুই কিলোমিটার সামনে যেতেই একটি কালভার্টের পাশে প্রথম সড়ক কাটা দেখতে পাওয়া যায়। কালভার্টের পাশে এমনভাবে কাটা হয়ে রাতে বৃষ্টি হওয়ায় পানি অপসারণের পর কিছু পানি জমে রয়েছে। এখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকশ’ গাড়ি সড়কের উপর পার্ক করে রেখেছেন। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর সড়ক কেটে আবার বড় গর্ত দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরত্বের পথে পরপর চারটি স্থানে সড়ক কেটে গর্ত তৈরি করে যৌথবাহিনীর দ্রুত আলীনগর পৌঁচাতে বাধাগ্রস্থ করার কৌশল নেয় দুর্বৃত্তরা। আলীনগর নতুন টিনশেটের একতলা নতুন ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায় দেওয়াল ভাঙ্গা। টিনের চালা চুরমার হয়ে আছে। নির্মাণাধীন ক্যাম্পের রাজমিস্ত্রি রাজিব বলেন, সারাদিন কাজ করে রাত ১টার দিকে নির্মাণ শেডে ঘুমাতে যাই। চোখে একটু একটু ঘুম এসেছে। এসময় হঠাৎ একের পর এক গুলি শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি ক্যাম্পের সামনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা আলী নগর স্কুলের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকেও পুলিশ গুলি করছে। এমন সময়
পূর্ব দিক থেকে একটি ট্রাক ও সেটির পেছনে কয়েকশ লোক অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। পরে স্কেভেটর এনে তছনছ করা হয়। ভয়ে আমরা কয়েকজন নালায় আশ্রয় নেই। সন্ত্রাসীরা আমাদের এক শ্রমিককে ব্যাপক মারধর করে এবং টাকা পয়সা নিয়ে যায়।
আলীনগর বাজারের মা স্টোরের স্বত্বাধিকারী রফিক উদ্দিন বলেন, রাতে গুলাগুলির আওয়াজে ভয়ে ঘুমাতে পারিনি। আমার দোকান থেকে ক্যাম্পের দূরত্ব আধা কিলোমিটারের কম। আমি দোকানের পেছনেই থাকি। কোন সময় গুলি এসে লাগে সেই আতংকে ছিলাম। সকাল থেকে পুলিশ-র্যাব অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ধরছে। এ ষড়ন্ত্রনা আর ভালো লাগছে না। কবে এখানে শান্তি আসবে কে জানে।
চোখে মুখে আতংকের ছাপ আলীনগর ঝর্ণা পাড়ার বাসিন্দা রাজিয়া বেগমের। তিনি বলেন, এখানে ১৩ বছর ধরে বসবাস করছি। কয়েক মাস ধরে যা শুরু হয়েছে তাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে ভয়েই আছি। এক দিয়ে ইয়াছিন বাহিনী, অন্য দিকে পুলিশ। কয়েকদিন পরপরই ঝামেলা হচ্ছে। আমরা চাই এখানে শান্তি ফিরে আসুক। আমরা কর্ম করে স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাল-ভাত খেতে চাই।
গত ৯ মার্চ ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সীতাকুন্ড মডেল থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় তৎকালীন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও বর্তমানে র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তিনটি হেলিকপ্টার নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে অংশ নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন সদস্য, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন সদস্য, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৮০০ জন সদস্যসহ সর্বমোট ৩ হাজার ১৮৩ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। তখন ইয়াছিন ও তার দলবল এলাকা থেকে পালিয়ে যায়। অভিযান শেষে সলিমপুর ও আলীনগরে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ও র্যাবের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। একটি সলিমপুরের প্রবেশমুখে এবং অন্যটি আলিনগর এলাকায়। আলীনগর স্কুলে বর্তমানে যৌথবাহিনীর সদস্য অবস্থান করছেন। তার পাশেই নতুন ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছিল। নতুন ক্যাম্পের ভবনসহ অবকাঠামোগত প্রায় ৯০ ভাগ কাজই শেষ হয়। বাকি ১০ ভাগ কাজ শেষের পথে ছিল। এ সময় নতুন ক্যাম্প যাতে স্থাপন করতে না পারে বাধা দিতেই নতুন করে এ সন্ত্রাসী হামলা চালায় ইয়াছিন বাহিনী।
যদিও গতবারের মতো এবারও যৌথ বাহিনীর বিশাল বহর এলাকায় ঢুকে তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দেন। কেটে দেওয়া রাস্তা বিকেলে স্কেভেটর দিয়ে ভরাট করা হয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
Leave a Reply