জলাধার ভরাট করে বাস টার্মিনাল করছে খোদ চসিক!
শিশির মাহমুদ
সাড়ে ৩ কানির জলাধার ভরাট করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন(চসিক) তৈরি করছেন নতুন সিটি বাস টার্মিনাল। যেখানে জলাবদ্ধতায় নাকাল চট্টগ্রাম নগরের লাখ লাখ মানুষ, সেখানে খোদ চসিকই বিশাল জলাধার ভরাট করেছেন। আর এ জলাধার ভরাট করার খেসারত দিচ্ছেন নগরের কুলগাঁও, বালুচরা, জালালাবাদ এলাকার প্রায় তিন লাখ মানুষ। এবারের বৃষ্টিতে বৃহত্তর এ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ডুবে যায় কুলগাঁও শেরেবাংলা সড়ক, ট্যানারি বটতল সড়কসহ আশপাশের ঘরবাড়িও। আগে বৃষ্টি হলে ভরাট করা পুকুর ও ডোবায় পানি সরে গেলেও এখন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে সেই পানি সড়ক ও মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে যাচ্ছে। আগে যা ছিল ডোবা-পুকুর, এখন সেখানে আস্ত বাস টার্মিনাল!
যদিও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫(সংশোধিত) অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জলাধার (পুকুর, ডোবা, খাল, বিল) ভরাট করা পরিবেশ ধ্বংসের শামিল। পরিবেশ আইন অনুযায়ী ডোবা, পুকুর ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষেধ এবং এটি একটি দন্ডনীয় অপরাধ।
এ প্রসঙ্গে চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী(পুর) মোহাম্মদ রিফাতুল করিম চৌধুরী বলেন, চসিকের কুলগাঁও বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এটি যে জায়গার উপর তৈরি করা হচ্ছে সেখানে আগে তিনটি পুকুর এবং ডোবা ছিল। এটি চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের মূল সড়ক থেকে ১২-১৩ ফুট গভীর ছিল। উত্তর চট্টগ্রামের জন্য কোন বাস টার্মিনাল না থাকায় পুকুর ও ডোবা ভরাট করেই বাস টার্মিনালটি তৈরি করতে হয়েছে।
জলাবদ্ধতা সৃষ্টি প্রসঙ্গে প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিফাতুল করিম চৌধুরী বলেন, এখন পরিস্থিতি এমন- একটি কাজ করলে অন্য আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পুকুর-ডোবা ভরাট করায় জলাধার ভরাট হয়েছে সত্য। তবে ওখানে থাকা দুম্বার খালটি দখল মুক্ত করে পুরোপুরি সচল করলে নতুন করে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে তা দূর হয়ে যাবে।

কুলগাঁও শেরেবাংলা নগর এলাকার বাসিন্দা রাজ্জাকুল হায়দার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশাল ডোবা ও তিনটি বড় পুকুর ভরাট করে এ বাস টার্মিনালটি তৈরির কাজ শুরু হয়। এটি এখন আমাদের কপালে জাহান্নাম ঢেকে এসেছে। আগে বৃষ্টি হলেই কুলগাও, অক্সিজেন, ট্যানারি বটতল, জালালাবাদ এলাকার পানি বাস টার্মিনালের বিশাল জলাধারে চলে যেতে। এখন সেখানে পানি যাওয়ার জায়গা বন্ধ হওয়া সেই পানি আমাদের ঘরবাড়িতে ঢুকছে। সামান্য বৃষ্টি হলে সড়ক ডুবে যাচ্ছে। ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন জলাধার ভরাট করায় আমাদের ভোগতে হচ্ছে। সামনে আরো কত ভোগান্তি পোহাতে হবে জানি না।
জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী শওকত আলী বলেন, আমার পাঁচতলা বাড়ি। আগে কখনো নিচতলায় পানি ওঠেনি। এবার নিচতলায় পানি ঢুকেছে। এর জন্য দায়ী সিটি করপোরেশন। তারা যেখানে মানুষকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবেন- সেখানে বাস টার্মিনালের নামে জলাধার ভরাট করে আমাদের জীবন-জীবিকাকে নরক বানিয়ে দিয়েছেন। বৃষ্টি হলে চলাচল করা দায় হয়ে গেছে। এ বিচার কার কাছে দিবো?
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের সহকারি পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, পুকুর-ডোবা ভরাট করে বাস টার্মিনাল তৈরি করার জন্য সিটি করপোরেশন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোন অনুমতি নেয়নি। আইনে যেহেতু পুকুর-ডোবা ভরাট নিষিদ্ধ, আমরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।
পরিবেশ কর্মী শফিকুর ইসলাম শফিক বলেন, রক্ষক এখানে ভক্ষকের ভূমিকায়। চসিক যেখানে মানুষকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিবেন, সেখানে জলাধার ভরাট করেছেন। এটি সত্যিই দুঃখজনক ঘটনা। জলাধার ভরাট করায় ওই এলাকার মানুষকে চসিকই এখন পানিবন্দি করে দিয়েছেন। যা একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণ মানুষ কখনোই প্রত্যাশা করে না। এখন এ সংকট থেকে কিভাবে মানুষকে মুক্তি দেওয়া যায় সেই বিকল্প চিন্তা করা উচিত।
চট্টগ্রাম নগরীর তিনটি মূল প্রবেশমুখের একটি অক্সিজেন মোড়। এ মোড়ে সার্বক্ষনিক যানজট সমস্যা নিরসনে ২০১৮ সালে কুলগাঁও এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় চসিক। এরপরে জমি অধিগ্রহণসহ নানান জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ চালু করা যায়নি। ২০২৪ সাল থেকে সিটি বাস টার্মিনালের কাজ শুরু হয়। নগরের কুলগাও সিটি করপোরেশন কলেজের পাশেই এ টার্মিনালটি তৈরি হচ্ছে। তিন দফা সময় বাড়িয়ে সাড়ে তিন কানির বিশাল জলাধার ভরাট করেই মূলত বা টার্মিনালটি তৈরি হচ্ছে। এখন অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। ফিনিশিং এর কাজ চলছে। এ বছরই বাস টার্মিনালটি চালু হবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস টার্মিনালটি নির্মাণের আগে বৃষ্টি হলেই নিচু হওয়ায় ডোবা ও বড় বড় পুকুরে পানি চলে যেতো। এটি ছিল কুলগাঁওসহ বিস্তর্ণ এলাকার বড় জলাধার। এটি থাকায় কুলগাঁওসহ আশপাশের এলাকায় বড় কোন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। কিন্তু বাস টার্মিনালের অবকাঠামগত কাজ যতই শেষ হতে থাকে, ততই জলাবদ্ধতার সমস্যা টের পেতে শুরু করেন স্থানীয় মানুষ। এবার জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হওয়ায় এ জলাধার ভরাট করাকেই দায়ী করছেন তারা। মাটি ও বালু দিয়ে ডোবা ও পুকুর ভরাট করা হয়েছে। চসিক ২৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ দশমিক ১০ একর জায়গায় টার্মিনালটিতে ১৬০টি বাস-ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে। টার্মিনালের প্রবেশপথে একটি তিনতলা ভবন, একটি সিটি বাস টার্মিনাল, একটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল, ২৫টি যাত্রী বোর্ডিং লেন, ১৪টি অতিরিক্ত ওয়েটিং লেন, একটি বড় খোলা হলরুম এবং তথ্যকেন্দ্র, পুরুষ ও নারীদের জন্য টয়লেট, ২২টি টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের বসার জায়গা, ওয়াইফাই সুবিধা, লাগেজ রুম, ট্যাক্সি বুকিং রুম, ফার্স্ট এইড স্টেশন, রেস্তোরাঁ, এসি বাসের যাত্রীদের বসার জায়গা, বাস-ট্রাক মালিকদের অফিস এবং বাস কর্মচারীদের আবাসন কক্ষ থাকছে। এখান থেকে চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, নাজিরহাট, ফটিকছড়ি, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ ৩২টি রুটে বাস চলাচল করবে। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ বাস চলাচল ও প্রায় লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। যাত্রীদের জন্য নতুন বাস টার্মিনালটি স্বস্তির খবর হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি এখন ভোগান্তির আরেক নাম।
Leave a Reply