শিশির মাহমুদ
চট্টগ্রামে মাদক মামলার তদন্তে নাম ওঠে আসে মো. ফোরকান মিয়ার। মাদক চোরাচালানে ফোরকান জড়িত কিনা তা যাচাই করতে তার মোবাইল নম্বর ০১৭৮১…২৭১ এর পরিবর্তে ০১৭১৮…২৭১ এর সিডিআর সংগ্রহ করেন এসআই মো. বদরুদ্দোজা। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সরকারিভাবে ভুল মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করেন। চতুরতার সঙ্গে তিনি ভুল সিডিআরটি ফোরকানের বলে তদন্তে চালিয়ে দেন। ফোরকানের উল্লেখ করে যে নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করেছিলেন, তা ছিল বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকার ইমরান উদ্দিন শুভ নামের এক ব্যক্তির। সিডিআর সংগ্রহে এসআই বদরুদ্দোজা নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে নিজেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর পরিচয়-পদবি তুলে ধরেন। ভুল নম্বরের সিডিআর তদন্ত শেষে নথিতে তুলে ধরে ফোরকানকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদও দেন। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ(সিএমপির) বিভাগীয় তদন্তে ধরা পড়ে এসআই বদরুদ্দোজার জাল-জালিয়াতি। তদন্তে পদে পদে প্রতারণার সত্যতাও উঠে আসে। তদন্তে জালিয়াতি করায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. বদরুদ্দোজার শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
সিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) মো. মাসুদ রানা বলেন, মাদক মামলার তদন্তে অভিযুক্ত এসআই বদরুদ্দোজা তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আসামির মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে অন্য নিরীহ ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করেছেন। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের সিডিআর প্রাপ্তির জন্য দাখিল করা আবেদনে নিজেকে পুলিশ ইন্সপেক্টরও দাবী করেন। সাক্ষীদের জবানবন্দি, তথ্য-উপাত্ত, চাকরি রেকর্ড পর্যালোচনা করে ভুল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ ও মিথ্যা পদবি ব্যবহারের সত্যতা সার্বিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এক বছরের জন্য স্থগিতকরণ করতে সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ১৩ জুন দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসআই বদরুদ্দোজা ১৯৮৯ সালের ৪ জানুয়ারি কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগদেন। পরবর্তীতে এসআই পদে পদোন্নতি লাভ করেন। চাকরি জীবনে তিনি অসদাচরণের ঘটনায় একটি গুরুদন্ড পেয়েছেন। ১১টি লঘুদন্ড পেয়েছেন। তার চাকুরির রেকর্ড সন্তোষজনক নয়।
অভিযুক্ত মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বদরুদ্দোজা বলেন, তদন্তের সময় সোর্সের ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভুল সিডিআর সংগ্রাহ করা হয়েছিল। এটি ছিল অনিচ্ছাকৃত ভুল। কাউকে বাঁচানোর জন্য ভুল সিডিআর সংগ্রহ করা হয়নি। তদন্ত নিরপেক্ষভাবেই করেছিলাম।
সিএমপি’র তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মাদক মামলার দুই আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেন তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর ডবলমুরিং থানার এসআই মো. বদরুদ্দোজা। এ জন্য নিরপরাধ ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের সিডিআর দাখিল, সেটি সংগ্রহে পদবি গোপন, আসামির পিসিপিআর(আগের অপরাধের খতিয়ান) অন্যের নামে চালানোর মতো জালিয়াতি করেছেন। গত ১৩ জুন পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা পড়ে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তদন্ত কর্মকর্তা বদরুদ্দোজা অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া মো আলাউদ্দিনের নামে আগের দুটি মামলা থাকার তথ্য উল্লেখ না করে অন্য আসামি আবদুল জলিলের পিসিপিআর হিসেবে দেখিয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ফোরকান এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সময়, আগে ও পরে চট্টগ্রামে ছিলেন না। বাগেরহাটের শরণখোলায় ছিলেন। এ কথার স্বপক্ষে ফোরকানের মোবাইল কললিস্ট দাখিল করা হয়। কিন্তু ফোরকানের বলে যে মোবাইল নম্বর দাখিল করা হয়, সেটির মালিক ইমরান উদ্দিন শুভ। তিনি শরণখোলার রায়েন্দা এলাকার কামাল উদ্দিন আকনের ছেলে। ইমরান কখনও চট্টগ্রামে আসেননি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফোরকানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঘটনার আগে ও পরে তিনি ঘটনাস্থল উত্তর কাট্টলীতে ছিলেন। তার এনআইডি ও টাওয়ার লোকেশন ছিল উত্তর পাহাড়তলী কর্নেলহাট আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাসা। এছাড়া ডবলমুরিং থানার মাদক মামলার অভিযোগ দেওয়ার আগে বদরুদ্দোজা আলাউদ্দিনের ভাগনে ও বাদ দেওযা আসামি ফোরকানের আপন ভাই এমরানের সঙ্গে তদন্তাধীন বিষয়ে মোবাইল ফোনে আলাপ করেন। ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর থেকে তিনি কর্ণফুলী থানায় ইয়াবা মামলার পলাতক আসামি এমরানের সঙ্গে অভিযোগপত্র দাখিলের আগের দিনও কথা বলেন।
Leave a Reply