ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তার এসআই শহীদুল ইসলাম
শিশির মাহমুদ
সম্পত্তি রক্ষায় পুলিশের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব খোয়ালেন এক গৃহবধূ। ভিকটিম গৃহবধুকে কৌশলে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসেন। বিরোধ সমাধানের কথা বলে ধর্ষণ করেন শহিদুল ইসলাম নামে পুলিশের এক এসআই। বর্তমানে সে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায় কর্মরত রয়েছেন। আর এ নিয়ে লুকোচুরি করছে চান্দগাঁও থানা পুলিশ। ধর্ষণ মামলায় এসআই গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ্যে না করার কৌশলী ভুমিকা পালন করেন তারা। চট্টগ্রামের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের ৮ নম্বর রোডের জুনায়েদুল হক মঞ্জিল ভবনের সপ্তম তলার একটি ফ্ল্যাট বাসায় এ ঘটনা ঘটে। তবে অপকর্ম করে শেষ রক্ষা হলো না এসআই শহিদুলের। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ধর্ষণ মামলায় আসামি পুলিশ সদস্যকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থাার দক্ষিণ আলোনীয় এলাকার আমিন মিয়ার ছেলে।
এ বিষয়ে জানতে নগরের চান্দগাঁও থানার ওসি জসিম উদ্দিন এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলামকে একাধিক বার ফোন করলেও ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলেও সাড়া দেননি। তবে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, থানায় এসে ভিকটিম গৃহবধূ ধর্ষণের মামলা করার পর আসামি শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে ধর্ষণ মামলায় আদালতে পাঠানো হয়। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ভিকটিমকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ওসিসি পাঠানো হয়েছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার ওসি মো. শামসুজ্জামান বলেন, আমার থানায় কর্মরত এসআই শহীদুল ইসলাম চট্টগ্রামে ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন অফিসিয়ালি তথ্য পেয়েছি। চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানা থেকে আমাদের শহীদুলকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়। তারপর আমি বিষয়টি উর্ধ্বতন স্যারদের জানিয়েছি। উনার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিবেন।
এসআই শহীদুল ইসলামের ছোট ভাই রাকিব বলেন, শহীদ ভাই চট্টগ্রাম ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন এমন খবর শুনিনি। পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের বলেননি। প্রসঙ্গত, শহীদুল ইসলামের স্ত্রীর মোবাইলে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তার দেবর রাকিবকে ফোন দেন। চান্দগাঁও থানা পুলিশ চট্টগ্রাম আদালেত দাখিল করার রেকর্ডে শহীদুলকে গ্রেপ্তারের তথ্য তার স্ত্রীর মোবাইল নম্বরে ফোন করে জানিয়েছেন বলে পুলিশ রেকর্ডে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ভিকটিম এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আমার স্বামী ঢাকার আশুলিয়া একটি রাবার গ্রুপে চাকরি করেন। ২০২৩ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার গুনাগরী এলাকায় অবস্থিত আমার পৈত্রিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে আমি বাঁশখালী রামদাসহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে যাই। সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্য এসআই শহিদুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। তিনি আমার সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়ার আশ্বাস দেন। তাঁর পরামর্শে বাঁশখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করি। পরে আদালতে একটি মামলা দায়ের করি। তারপর থেকে আমার সঙ্গে মাঝে মধ্যে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে থাকে। বিভিন্ন সময় আমার চলমান মামলা ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে আইনগত পরামর্শ দেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এসআই শহিদুল বাঁশখালী আমার বাসায় এসে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণ করেন। তখন আমার বাড়িতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় তার পরামর্শে আমার পাঁচ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের সেট ও সম্পত্তির মূল দলিল নিরাপত্তার স্বার্থে তার ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণের জন্য প্রদান করি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আমার প্রয়োজন হওয়ায় উক্ত স্বর্ণালঙ্কার ও সম্পত্তির মূল দলিল ফেরত চাই। তখন আসামি আমার সম্পত্তির মূল দলিল ফেরত দিলেও স্বর্ণালংকার পরে দিবে বলে জানান। এর মধ্যে তিনি বাঁশখালী থেকে অন্য জায়গায় বদলী হয়ে চলে যান। বদলি হলেও আমার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথাবার্তা হতো।
ভিকটিম গৃহবধু এজাহারে আরো উল্লেখ করেন, গত ৭ জুলাই বিকালে এসআই শহিদুল তার হোয়াটসএ্যাপ নম্বর থেকে আমার ব্যবহৃত হোয়াটসএ্যাপ নম্বরে কল করেন। সে চট্টগ্রামে অবস্থান করছে। তার চট্টগ্রাম আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার কাজ আছে। সে আরও জানায়, আমার জায়গা-জমি সংক্রান্ত চলমান মামলা, পূর্বের স্বর্ণালঙ্কারের বিষয়টি সমাধান করবেন বলে আমাকে চট্টগ্রামে আসার জন্য অনুরোধ করে। আমি বৃষ্টিপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামে আসতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে পুনরায় আশ্বস্ত কওে বলে যে, এ বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য আমার উপস্থিতি প্রয়োজন। আমি তার অবস্থানরত বাসায় সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকতে পারবো। আসামি একজন পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় তার কথায় বিশ্বাস করে ৭ জুলাই রাত ৯টার দিকে বান্দরবান থেকে বাসে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। তার দেওয়া ঠিকানা মতে চান্দগাঁও থানাধীন চান্দগাঁও আবাসিকের জুনায়েদুল হক মঞ্জিলের সপ্তম ভলায় বাসায় হাজির হই। বাসায় প্রবেশ করে দুই বেডরুমে একটি ফ্যামিলি বাসা দেখি। সেখানে একজন মহিলা তাহার দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন। মহিলা ও তার সন্তানদের একটি কক্ষে অবস্থান করেন। এসআই শহিদুল অপর কক্ষে অবস্থান করছেন। আমি সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ, চলমান মামলা নিয়ে আলোচনার জন্য আসামির কক্ষে প্রবেশ করি। আলোচনার শেষে মহিলার কক্ষে রাত্রিযাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করি। কিন্তু সে আমাকে আশ্বস্ত করে, আমার কোনো ধরনের অসুবিধা হইবে না। তার কক্ষেই অবস্থান করতে বলেন। আমি কক্ষের খাটের একপাশে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু রাত ১টার দিকে আসামি আমার শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করিতে থাকে। আমি তার আচরণে আপত্তি জানিয়ে বাধা দেই। কিন্তু সে আমার আপত্তি উপেক্ষা করিয়া জোরপূর্বক আমার মুখ চেপে ধরে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন।
Leave a Reply